প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫ । ৬:০৯ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা ও বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া

ঢাকা ডেস্ক ২৪

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি হলো ডিজিটাল বাণিজ্য। এর ভেতরেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বা সীমান্ত-পার ই-কমার্স। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন একটি দেশের উদ্যোক্তা অনলাইনে তার পণ্য বা সেবা অন্য দেশের ভোক্তার কাছে বিক্রি করেন, তখন সেটিই ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স। আন্তর্জাতিক বাজারে এই খাতের প্রবৃদ্ধি অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত। বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাজারে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, আইটি ও ডিজিটাল সেবা, কৃষিজাত পণ্য, এমনকি দেশীয় খাবার–সব মিলিয়ে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রি করছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। তবে এই সম্ভাবনার সাথে রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। নীতিমালা, অবকাঠামো, দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার নানা ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ এখনো ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স মূলত আমাজন, ইবে, আলিবাবা কিংবা দারাজ (যা আলিবাবা গ্রুপের অংশ) এর মতো আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাক বা RMG এখনো দেশের প্রধান শক্তি হলেও, ধীরে ধীরে হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য, লেদার প্রোডাক্টস, গহনা, কৃষিজাত খাদ্যপণ্য এবং ডিজিটাল সেবা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইসিটি খাতে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বড় একটি অংশ এসেছে ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে বছরে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে। যদি এই পোশাক খাতকেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈশ্বিক গ্রাহকের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে আয় বাড়বে আরও কয়েকগুণ।

সীমাবদ্ধতা (Challenges)

বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা যদিও ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সে আগ্রহী, কিন্তু বেশ কিছু জটিল সমস্যা তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

১. পেমেন্ট সিস্টেম সমস্যা

আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য PayPal, Stripe-এর মতো জনপ্রিয় পেমেন্ট গেটওয়ে এখনো বাংলাদেশে চালু হয়নি। ফলে উদ্যোক্তাদের জটিল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও খরচবহুল। এ কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন।

২. লজিস্টিকস ও শিপমেন্ট জটিলতা

আন্তর্জাতিক কুরিয়ার খরচ অনেক বেশি এবং সেবার মানও উন্নত নয়। অনেক সময় কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়, ফলে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো যায় না। ক্রেতাদের জন্য পণ্য রিটার্নও বড় সমস্যা।

৩. নীতি ও আইনের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতিমালা নেই। রপ্তানি সংক্রান্ত জটিল শুল্ক কাঠামো, কর, এবং ডকুমেন্টেশন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

৪. দক্ষতার ঘাটতি

অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং কিংবা কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে যথেষ্ট জানেন না।

৫. ট্রাস্ট ফ্যাক্টর বা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকট

বাংলাদেশি পণ্যের মান, প্যাকেজিং, এবং আফটার-সেলস সার্ভিসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অনেক সময় মানসম্মত সার্টিফিকেশনও অনুপস্থিত থাকে।

সম্ভাবনা (Opportunities)

তবে এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেও বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে।

১. তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। সাধারণ রপ্তানির পাশাপাশি ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিশেষায়িত পোশাক, যেমন প্রিমিয়াম ফ্যাশন, হিজাব, ঐতিহ্যবাহী জামদানী কিংবা কাস্টমাইজড গার্মেন্টস সহজেই বিদেশি বাজার ধরতে পারে।

২. হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্য

বাংলাদেশের নকশিকাঁথা, জামদানি শাড়ি, মাটির পাত্র, শোলা শিল্প কিংবা পাটজাত সামগ্রী আন্তর্জাতিক বাজারে ভিন্ন মাত্রার আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যেই Etsy-এর মতো প্ল্যাটফর্মে এসব পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে।

৩. ডিজিটাল সেবা ও ফ্রিল্যান্সিং

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সিং কর্মী সরবরাহকারী দেশ। আইটি সেবা, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট ক্রিয়েশন কিংবা গেম ডেভেলপমেন্টে বিশাল বাজার রয়েছে। এগুলো ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।

৪. কৃষি ও খাদ্যপণ্য

অর্গানিক ও নিরাপদ কৃষিপণ্যের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশি আম, চা, মসলা, শুঁটকি মাছ, শুকনো খাবার কিংবা মধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজার ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল সম্ভাবনাময়।

৫. প্রবাসী বাংলাদেশি বাজার (Diaspora Market)

ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী তাদের সংস্কৃতি ও খাদ্যের সাথে সংযুক্ত থাকতে চান। তাদের জন্য দেশি খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প অনলাইনে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ বিশাল।

এগিয়ে যাওয়ার উপায় (Way Forward)

বাংলাদেশ যদি এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়, তবে কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

১. সহজ পেমেন্ট সিস্টেম চালু

PayPal, Stripe-এর মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে দ্রুত চালু করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স রেমিট্যান্সে সহজ নিয়ম তৈরি করতে হবে।

২. আধুনিক লজিস্টিকস ও কাস্টমস সংস্কার

ই-কমার্স রপ্তানির জন্য বিশেষ করিডোর বা “ই-কমার্স এক্সপ্রেস লেন” চালু করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গুদাম, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং কম খরচের কুরিয়ার সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে।

৩. নীতি ও আইনগত সহায়তা

একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ট্যাক্স ছাড় ও বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।

৪. দক্ষতা উন্নয়ন

ডিজিটাল মার্কেটিং, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ব্যবস্থাপনা, ব্র্যান্ডিং, কাস্টমার সাপোর্ট–এসব বিষয়ে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।

৫. মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্র্যান্ডিং

আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, সার্টিফিকেশন (যেমন ISO, HACCP) নিশ্চিত করতে হবে। “Made in Bangladesh” ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত করতে হবে।

৬. প্রবাসী বাজারকে টার্গেট করা

প্রবাসীদের জন্য দেশি খাবার, পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের আলাদা ডেলিভারি নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে। এতে বাজার আরও প্রসারিত হবে।

বিশ্বব্যাপী ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা যদি সঠিক সময়ে সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন, তবে এই খাতে বিশাল সাফল্য অর্জন সম্ভব। সীমাবদ্ধতা দূর করতে হলে জরুরি হলো–সহজ পেমেন্ট সিস্টেম চালু, আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা, কার্যকর নীতি-সহায়তা, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা।

যদি এগুলো বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যেই ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স থেকে ১০-১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে না, বরং লাখ লাখ তরুণ ও নারী উদ্যোক্তার জন্য নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।

প্রিন্ট করুন