প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫ । ৬:০৬ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য

ঢাকা ডেস্ক ২৪

অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতার ফল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোনো রাষ্ট্র যদি তার ভৌগোলিক সীমান্ত, আকাশসীমা ও সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে না পারে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই? ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা শক্তি একে অপরের পরিপূরক। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কোনো জাতি কখনো টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারেনি।

বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শুধু রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও অপরিহার্য।

ইতিহাসের দৃষ্টান্ত: প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

১. রোমান সাম্রাজ্য

রোমানরা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য নয়, বরং তাদের অদম্য সেনাবাহিনী ও দুর্গনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সমগ্র ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। নিরাপদ সমুদ্রপথ ও সড়ক নেটওয়ার্কের কারণে রোম হয়ে উঠেছিল বিশ্বের বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথে অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও ভেঙে পড়ে।

২. ওসমানীয় সাম্রাজ্য

ওসমানীয়রা ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে কয়েক শতাব্দী ধরে সমৃদ্ধ হয়েছিল। তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল নৌ ও স্থল প্রতিরক্ষা শক্তি। যখন সামরিক শক্তি ক্ষয়ে যেতে শুরু করল, তখন বাণিজ্য পথও হাতছাড়া হয়ে গেল এবং সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল।

৩. ব্রিটিশ সাম্রাজ্য

ব্রিটিশরা “Rule the waves” নীতি মেনে সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রবাণিজ্য নিরাপদ থাকায় শিল্পবিপ্লবের সুফল লুটতে তারা সক্ষম হয়েছিল। নৌবাহিনীর প্রভাব হারানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক শক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসে।

৪. জাপান ও জার্মানি (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী)

যুদ্ধোত্তর ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপান ও জার্মানি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার আওতায় থেকে তারা সামরিক ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মনোযোগ দেয়। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকায় বিনিয়োগকারীরা আস্থা রেখেছে এবং প্রযুক্তি নির্ভর উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।

৫. দক্ষিণ কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ার সামরিক হুমকি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া আজ বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত রাষ্ট্র। এর পেছনে মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শক্তিশালী সেনাবাহিনী বিনিয়োগকারীদের আস্থা দিয়েছে—দেশটি যে যুদ্ধঝুঁকির মধ্যেও টিকে থাকতে পারবে।

আধুনিক প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতি

আজকের বিশ্বে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বৈদেশিক বিনিয়োগ: বিনিয়োগকারীরা সবসময়ই নিরাপদ পরিবেশ খোঁজেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে যে তাদের মূলধন ও শিল্প ঝুঁকিমুক্ত থাকবে।

বাণিজ্যিক করিডর ও সমুদ্র অর্থনীতি: সমুদ্রসীমায় ব্লু ইকোনমি, ট্রানজিট করিডর, বন্দর ও সাপ্লাই চেইন নিরাপদ থাকলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

সাইবার নিরাপত্তা: ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে শুধু স্থল, নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা নয়—সাইবার প্রতিরক্ষাও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ।

সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহ দমন: যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। শক্তিশালী সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, ভারত-চীন-মিয়ানমার সীমান্ত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান অর্থনৈতিকভাবে একে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

সমুদ্র অর্থনীতি: বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস, খনিজ ও মৎস্যসম্পদ আহরণের জন্য নৌবাহিনীর সক্ষমতা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম পোশাক রপ্তানিকারক। নিরাপদ সমুদ্রপথ ও বিমান যোগাযোগ না থাকলে এ সাফল্য সম্ভব হতো না।

বিনিয়োগ পরিবেশ: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শান্তিরক্ষা মিশন: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনারা শুধু দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে না, বরং অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা: সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনী ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্পের সময় জনগণকে রক্ষায় তাৎক্ষণিক ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের দুর্যোগ থেকে অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবদান অনস্বীকার্য।

প্রতিরক্ষা বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত

অনেকে মনে করেন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় মানে অপ্রয়োজনীয় খরচ। কিন্তু বাস্তবে এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, আস্থা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগ।

শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দেশের অর্থনৈতিক সুনাম বাড়ায়।

প্রতিরক্ষা শিল্পকে ঘিরে স্থানীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত গড়ে ওঠে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

প্রতিরক্ষা খাত থেকে সৃষ্ট উদ্ভাবন (যেমন ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, জিপিএস) পরে বেসামরিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়।

অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করতে হলে একটি রাষ্ট্রকে শুধু শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে নজর দিলেই হবে না। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় রয়েছে, সেটিকে নিরাপদ ও টেকসই করতে হলে আমাদের অবশ্যই আধুনিক ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রিন্ট করুন