প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫ । ৫:০৭ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)

অনলাইন ডেস্ক

ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF) হলো একটি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক উদ্যোগ যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রস্তাবিত। এটি মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে। IPEF আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২২ সালের ২৩ মে চালু হয়। IPEF-এর প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো হলো:

টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি: সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং এই প্রবৃদ্ধি যেন পরিবেশবান্ধব ও সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে তা নিশ্চিত করা।

প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি: সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা।

ডিজিটাল অর্থনীতি: ডিজিটাল বাণিজ্য, ডেটা সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা সহ ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা: সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করা, যাতে কোনো একক দেশ বা ঘটনার উপর নির্ভরতা কমে আসে এবং সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ে।

পরিষ্কার অর্থনীতি: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তির প্রসারে সহযোগিতা করা।

ন্যায্য অর্থনীতি: শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই সহ ন্যায্য অর্থনৈতিক নীতি ও চর্চা নিশ্চিত করা।

IPEF-এর সদস্য দেশগুলো হলো অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, ভারত,ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফিজি।

বাংলাদেশের IPEF-এর সদস্য হওয়া উচিত কিনা তা একটি জটিল প্রশ্ন এবং এর পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি রয়েছে।

পক্ষে যুক্তি:

অর্থনৈতিক সুযোগ: সদস্যপদ বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সরবরাহ শৃঙ্খল: সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা জোরদার করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি: ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

টেকসই উন্নয়ন: পরিচ্ছন্ন অর্থনীতি ও সবুজ প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়ায় এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ এবং IPEF-এর সদস্যপদ এই অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রভাব বাড়াতে পারে।

বিপক্ষে যুক্তি:

চীনের প্রভাব: IPEF মূলত চীনকে কেন্দ্র করে গঠিত হওয়ায়, এর সদস্যপদ চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা: IPEF-এর কিছু নিয়মকানুন বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে যা বর্তমান রপ্তানি বাজারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

অস্পষ্টতা: IPEF-এর কিছু নীতি ও উদ্দেশ্য এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, যা বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তুলতে পারে।

সম্পদের সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ ও জনবল IPEF-এর সকল শর্ত পূরণে সক্ষম নাও হতে পারে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশের উচিত IPEF-এর সকল শর্তাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা এবং এর সম্ভাব্য সুবিধা ও অসুবিধাগুলো সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করা।

চীনের দৃষ্টি ভঙ্গি: চীন IPEF-এর প্রতি সতর্ক এবং কিছুটা সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখে। চীনের প্রধান উদ্বেগগুলো হলো:

চীনকে বাদ দেওয়া: চীন মনে করে যে IPEF মূলত তাদের প্রভাব কমানোর এবং তাদের বাদ দিয়ে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা। যদিও IPEF সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করে না, তবে এর গঠন ও উদ্দেশ্য চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিত দেয়।

ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: চীন IPEF-কে একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগের চেয়ে বেশি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখে, যার লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানো।

বাণিজ্যিক বিভাজন: চীন আশঙ্কা করে যে IPEF সদস্য দেশগুলোকে তাদের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক সীমিত করতে এবং বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করতে উৎসাহিত করতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে বিভক্ত করতে পারে।

প্রযুক্তি ও ডেটা: ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ডেটা সুরক্ষার উপর IPEF-এর জোর দেওয়াকে চীন তাদের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ডেটা প্রবাহের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় বাধা হিসেবে দেখতে পারে।

তবে, চীন সরাসরি IPEF-এর বিরোধিতা না করে বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যান্য ফোরাম, যেমন RCEP (Regional Comprehensive Economic Partnership)-এর উপর জোর দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

মো. মাহমুদুল হাসান

ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও কৌশল বিশ্লেষক

প্রিন্ট করুন